মানুষ -- ভিন্ন চোখে মানুষের গল্প || শাহরিয়ার সোহাগ || পর্ব - ২
চোখের
সামনেই নীল সমুদ্র, তীরে বাঁধা মাছ ধরার অসংখ্য ছোট বড় নৌকা, ট্রলার। সমুদ্রের
উল্টোপাশে সারি সারি নারকেল গাছ। সমুদ্রের ঢেউ আঁচড়ে পড়ছে তীরে। এই ঢেউয়ের নিজস্ব
একটা ছন্দ আছে। কখনো থেমে থেমে, কখনো আবার দমকা হাওয়া লাগে গায়ে, এই হাওয়া খেতেই
নাকি মানুষ টাকা খরচ করে শহর থেকে এই দ্বীপে ঘুরতে আসে। এই হাওয়া ই ছোট্ট এই
দ্বীপটিকে করেছে প্রেমময়। এই দ্বীপে আকাশ আর সমুদ্রের নীল মিলেমিশে একাকার হয়ে
যায়। এখানে সামুদ্রিক প্রবাল, ঢেউয়ের ছন্দ সবাইকে মুগ্ধ করে। এ দ্বীপের যেদিকে
চোখ যায় শুধু নীল আর নীল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। উপরে নীল আকাশ আর নীচে সমুদ্রের
নীল ঢেউ মনকে ছুঁয়ে যায় নিমিষেই। যেন প্রকৃতির সাথে প্রেম করার এটাই একমাত্র
জায়গা। এখানকার আবহাওয়া যেন মানুষের চরম আকাঙ্খিত। মন খারাপের সময় একান্ত প্রিয়
হয়ে উঠে এই দ্বীপের মিষ্টি শীতল বাতাস, যা মুহূর্তেই হৃদয়, মন আর পুরো দেহজুড়ে
নিয়ে আসে স্বস্তির স্বর্গীয় পরশ।
সমুদ্রের
আঁচড়ে পড়া ঢেউ আর নারকেল গাছের সারির মাঝখানে বালুময় যে বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা
সেখানে একটা চায়ের দোকান আছে। ছোট্ট একটা খুপড়ি দোকান। চা, রুটি, কলা, কয়েক পদের
বিস্কুট, চানাচুর, ডাব, ছোট সাবান শ্যাম্পু পাওয়া যায়। টুকটাক আরো অনেক দরকারি
জিনিসও পাওয়া যায়। ছোট একটা বাক্স টিভিও আছে। দোকানদার জাকির যতক্ষণ দোকানে থাকে
ততক্ষণ বিরতিহীন ভাবে টিভিও চলতে থাকে। এখানে মানুষ ঘুরতে আসে একটা নির্দিষ্ট
সময়ে। তখনই এখানে দোকানটা জমজমাট থাকে। অন্য সময় তেমন লোকজন থাকে না। এই দ্বীপের
মানুষ যারা জন্মের পর থেকেই বড় হয়েছে সমুদ্র দেখতে দেখতে। তারা আয়োজন করে সমুদ্র
পাড়ে এসে বাতাস খাওয়ার মত সৌখিনও না। সমুদ্র দেখে ওয়াও ওয়াও করা, হাটু পানিতে
গড়াগড়ি দেওয়া, ভেজা বালুতে গর্ত করার মত ন্যাকামি কেবল শহর থেকে আসা মানুষেরাই
করে। দ্বীপের মানুষজন এসব দেখে হাসে। তবে দোকানদারি করতে করতে শহুরে মানুষদের এসব
ন্যাকামি দেখতে দেখতে জাকিরের এখন আর হাসি পায় না। এই ন্যাকা ন্যাকা মানুষগুলোই
জাকিরের কাস্টমার। গল্পপ্রিয় জাকির চেষ্টা করে এই দ্বীপ নিয়ে সবাইকে ভালো পরামর্শ
দেওয়ার। ওর দ্বারা যদি কারো উপকার হয় তাহলে খারাপ কি।
চায়ের
দোকানের বাইরে বালুতে বসে তাহি, ইশি, ইকি, টুকি টিভিতে সিনেমা দেখছে। বাংলা
সিনেমা। দোকানদার জাকির ওদেরকে নতুন একটা বিস্কুটের প্যাকেট ছিঁড়ে খেতে দিয়েছে
সেই কখন। সেদিকে ওদের কারোর ই খেয়াল নেই। যেন সবাই একসাথে সিনেমার ভিতরেই ঢুকে
গেছে। চোখ দিয়ে সিনেমা গিলে খাচ্ছে। অথচ যখন দোকানে এসেছিল সবগুলোর এমন একটা ভাব
যেন ক্ষুধায় পেটের নাড়ি চুপষে গেছে। সেজন্যই তো দয়া করে জাকির ওদেরকে বিস্কুট খেতে
দিয়েছে। এই দ্বীপে জাকির ওদেরকে যতটা ভালোবাসে ওদের বাপ মাও ততটা ভালোবাসে না।
পড়াশোনার বালাই নেই। গোসল তো ইচ্ছে হলেই করা যায়। যদিও ওদের কাছে ভালোবাসা বলতে
কেবল খাবার খাওয়ানো আর আদর করা। এই দ্বীপে ওদের বাপ-মা নিজেরাই খাবার যোগাড় করতে
পারে না। ছেলে মেয়েদের আর কি খাওয়াবে। এই নিষ্ঠুর দ্বীপে এই জাকির ই নিয়ম করে
ওদেরকে খাওয়ায়। যখন যতটুকু পারে, দেয়। সমুদ্রের কাছেই, দোকানের পেছনে নারকেল
বাগানের ভেতরেই জাকিরের বাড়ি। বাড়ির জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। পয়সাওয়ালা
মানুষরা বিয়ের পর পর সমুদ্র দেখতে আসলে রিসোর্টে যেমন রুম চায়। সবসময় যে নিজের বউ
নিয়ে আসে তাও না। সাথের মানুষটা যে ই হোক, যার বউ ই হোক, হোটেলের খাতায় তাকে নিজের
বউ হিসেবেই পরিচয় দেয়। তারপর সাথের মেয়ের পছন্দে এমন রুম নেয়, যেন জানালা খুললেই
সমুদ্র দেখা যায়। জাকিরের অবশ্য সমুদ্র নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। ওর জন্ম হয়েছে
সমুদ্রের পাড়ে। যে বড় হয়েছে জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে। তাকে কি আর
সমুদ্রের লোভ দেখানো যায়! শহরের মানুষ যারা ইয়া বড় বড় টিভিতে সমুদ্র দেখে,
তারা এখন ইয়া বড় বড় জানালা দিয়ে সত্যি সত্যি সমুদ্র দেখতে চায়। এই যে প্রতিদিন
হাজার হাজার মানুষ এই দ্বীপে ঘুরতে আসে এত টাকা খরচ করে, শুধু দুচোখ ভরে সমুদ্র
দেখবে বলে। এই মানুষের অনেকেই অতি উৎসাহী হয়ে দ্বীপের পরিবেশ ধ্বংস করে। কিছু
খেয়েই পলিথিন, প্লাস্টিকের প্যাকেট বোতল ফেলছে সমুদ্রে পাড়ে। ভাটার সময় সেসব
অনিচ্ছাতেই হজম করছে সমুদ্র। জাকির কিছু বলতে পারেনা। প্রতিবাদ করলে পেটে ভাত
জুটবে না। এখানে যে মানুষগুলো ঘুরতে আসে, তারা সমুদ্রের পাড়ে বসে জাকিরের দোকানে
চা খায়, ডাব খায়। এই টাকায় জাকিরের সংসার চলে। কাস্টমার লক্ষী। লক্ষ্মী দু একটা
দোষ করলে দেখেও না দেখার ভান করার নীতিতে চলে জাকির। কাঠ বাঁশের উপর ছোট্ট একটা
দোকান। সামনে টিনের বাড়তি ছাউনীর নিচে কয়েকটা চেয়ার পাতা থাকে সবসময়। সমুদ্র
পাড়ে হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত মানুষেরা এখানে বসে একটু বিশ্রাম নেয়। জাকিরের দোকান
থেকে পানি খায়, চা খায়, সিগারেট খায়। একটু বড়লোক হলে ডাব খায়, কফি খায়। বিস্কুট,
পান, রুটি, চানাচুরও খায় কেউ কেউ। পকেটের উপরেই মানুষের রুচি নির্ভর করে। এই অল্প
আয়ের জাকিরের বেচাকেনা যেমনই হোক, চেষ্টা করে ইশি, তাহি, ইকি, টুকি, গুলুদের কিছু
খাওয়ানোর জন্য। তার প্রতিদান অবশ্য তারা দেয়। ওদের পাঁচ বন্ধুর কেউ না কেউ রাতে
দোকান পাহারা দেয়। এই যে এক বছর আগের কথা। হঠাৎ রাতে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠেছিলো।
ওরা পাঁচ বন্ধু মিলে মাঝরাতে জাকিরকে ডেকে আনলো দোকানের মাল ছামানা সরানোর জন্য।
সে কি ঝড়! সেই রাতে দোকান ভেঙ্গে গিয়েছিল। মালামাল আগেই সরানোতে খুব একটা ক্ষতি
হলো না। তারপর থেকে ওদের প্রতি জাকিরের ভালোবাসা আরো বেড়ে গেছে। এই দ্বীপ দেখতে
যতটা সুন্দর, প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই দিক ততটাই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। লোকালয় থেকে
বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে সহযোগিতা আসতেও যেমন সময় লাগে, তেমনি বিপদে পড়লে লোকালয়ে
পৌঁছানোও অসম্ভব হয়ে ওঠে। বিশাল বড় বড় ঢেউয়ে ভেঙে যায় মানুষের ঘরবাড়ি,
গাছপালা। দ্বীপ যেন মুহূর্তেই অচেনা হয়ে ওঠে। তারপর প্রতিনিয়ত দেখতে দেখতে সেই
অচেনা দ্বীপটা আবার চেনা হয়ে ওঠে সবার কাছে। তারপর আবারো কোনো দুর্যোগে হয়ে ওঠে
অচেনা। এটাই এই দ্বীপের জীবন চক্র। এমন দুর্যোগের সময় মানুষেরই অভাবের কুলকিনারা
থাকে না। মানুষ বাদে অন্য যেসব প্রাণী এখানে থাকে তাদের অবস্থা তো আরো দুর্বিষহ।
কারণ তারা তো সব মানুষের দয়াতেই বেঁচে আছে। জাকির লোকটা ভালো মানুষ। একটু বদরাগী,
কাটখুট্টা টাইপের। বয়স ষাটের কোঠায়। ছানি পড়ে এক চোখের দৃষ্টি প্রায় বন্ধ হয়ে
গেছে। আরেক চোখ দিয়েই পৃথিবী দেখছে। প্লাস্টিক ফ্রেমের একটা চশমা আছে। কাঁচে
রাজ্যের রেখা। এটা পরে মাঝেমধ্যে পৃথিবীটাকে পরিষ্কারভাবে দেখার চেষ্টা করে সে।
সাত আট বছর আগে এখানে একদল ডাক্তার এসেছিল ফ্রিতে এখানকার মানুষদের চোখ পরীক্ষার
জন্য। তারা ই ফ্রিতে ওষুধ, চশমা এসব দিয়েছিল। এত বছর ধরে এই চশমাটা যে টিকে আছে
এটাই বা কম কিসে। পয়সা খরচ করে শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর পক্ষে না জাকির। শহরে
যাওয়া মানে যে শুধু গাড়ি ভাড়া জাহাজ ভাড়া তা তো না। এত এত টেস্ট,
ডাক্তারের ফিস, সে মেলা টাকার ব্যাপার। অপরিচিত শহরে গিয়ে নিজের থাকা খাওয়ার
খরচটাও অনেক। তার দোকানে চা খেতে আসা শহরের অনেক মানুষই তাকে শহরে যাওয়ার দাওয়াত
দিয়েছে। বলেছে শহরে গেলে যেন তাদেরকে জানায় তারা দেখা করবে, কোনো দরকার হলে উপকার
করবে। জাকির অবশ্য জানে সে সব মুখের কথা। শহরের ব্যস্ত মানুষের খেয়ে দেয়ে এত
সময় নেই যে তাকে সাথে নিয়ে ঘুরঘুর করবে। সে এই দ্বীপের সামান্য একটা চায়ের
দোকানদার। শহরের বাতাসে সে মানানসই না। আপন রক্তই যেখানে খোঁজ নেয় না, সেখানে এই
অল্প দিনের পরিচয়ের মানুষগুলোর ভালোবাসা উৎলে ওঠার কোনো কারণ ই নেই। যেমনে চলছে
তেমনি চলুক এই নীতিতেই চলছে জাকির। জাকিরের দুই ছেলে। বড় ছেলে এই দ্বীপে অটো
গাড়ি চালায়। আর ছোট ছেলে একটা হোটেলে কাজ করে। বড় ছেলেকে বিয়ে দিয়েছে এই
দ্বীপেই। বড় ছেলের ঘরে একটা নাতিন আছে। ওর নাম মেরিনা। নামটা জাকির রেখেছে।
মেরিনার জন্মের সময় ৩০ টাকা দিয়ে জাকির একটা নামের বই কিনেছিল নাতিনকে একটা সুন্দর
নাম রাখবে বলে। মেরিনা ইসলামিক নাম। নামের অর্থ সমুদ্রের রাণী। সমুদ্রের পাড়ে ধুকে
ধুকে বেঁচে থাকা জাকির তার নাতিনের নাম রেখেছে মেরিনা। যার অর্থ সমুদ্রের রাণী।
এমন নাম রাখতেও সাহস লাগে। জাকির মাঝে মাঝে মেরিনাকে দোকানে আনে, তার সাথে
খেলা করে। জাকির আর মেরিনার মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব। সারাদিন বালুর মধ্যে গড়াগড়ি
দেয়, খেলা করে। তবে জাকিরের জন্য বাড়ির কেউ মেরিনাকে শাসন করতে পারে না। জাকির ঢাল
হয়ে থাকে। তাই মেরিনাও ওর দাদা বলতে পাগল। কোনো আবদারের জন্য দাদা ই তার শেষ
ভরসা। জাকিরের শ্বশুরবাড়িও এই দ্বীপে। যৌবনকালে জাকির নায়ক সেজে, গলায়
রুমাল বেঁধে ঘুরে বেড়াতো, মেয়ের বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। আর তখনই জাকিরের
প্রেমে পড়েছিল তার এখনকার বউ। তারপরেই তো ওদের বিয়ে হয়। ঘটনা সত্য মিথ্যা কেউ
জানে না। সত্য খুঁজে বের করার উপায়ও নেই। তবে জাকির সবাইকে এমন ঘটনাটাই বলে। জাকির
ওর বউকে খুব ভালোবাসে। দোকান বন্ধ করে রাতের বেলা বাড়ি ফেরার সময় বউয়ের জন্য
একটা কেক, নাইলে এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে যায়। ওর যতটুকু সাধ্য আর কি। শহরের
বেডা মানুষ তো বউ পোলাপান না নিয়ে গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে এই দ্বীপে আসে ঘুরতে।
জাকিরের অবশ্য এত কষ্ট করা লাগে না। যখন একটু রোমান্টিক ফিল করে তখন দোকান বন্ধ
করে বউকে ডেকে এনে সমুদ্রের পাড়ে এসে বউয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, বউয়ের হাত ধরে
হাটে, সমুদ্রের পানিতে একটু পা ভেজায়। ওর বউ নাকি তখন খুব শরম পায়। তবে এই
চুলপাকা বয়সেও যে জাকিরের ভেতরটা প্রেমে ভরপুর সেটা স্পষ্ট।
.png)


No comments